সিলেটের টাঙ্গুয়ার হাওর একটি অত্যাশ্চর্য রামসার স্থান যা তার স্ফটিক-স্বচ্ছ জল, পরিযায়ী পাখি, জীববৈচিত্র্য এবং নৌকা ভ্রমণের জন্য পরিচিত।
টাঙ্গুয়ার হাওর, সিলেট
পরিচয়
সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর এবং ধর্মপাশা উপজেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম মনোমুগ্ধকর জলাভূমি। "রামসার স্থান" (আন্তর্জাতিক গুরুত্বের একটি জলাভূমি) হিসেবে স্বীকৃত, টাঙ্গুয়ার হাওর অত্যাশ্চর্য প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্ফটিক-স্বচ্ছ জল, ভাসমান গ্রাম এবং বন্যপ্রাণীর সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যের আবাসস্থল। এর অফুরন্ত দিগন্ত এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কারণে, এটি প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্যগুলির মধ্যে একটি।
রামসার স্থান
রামসার স্থান হলো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি যা 'রামসার কনভেনশন' (The Convention on Wetlands) অনুযায়ী স্বীকৃত এবং সংরক্ষণের জন্য মনোনীত। ১৯৭৫ সালে কার্যকর হওয়া এই চুক্তিটি ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বাংলাদেশে তিনটি রামসার স্থান রয়েছে: সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং হাকালুকি হাওর।
ইতিহাস ও তাৎপর্য
টাঙ্গুয়ার হাওর প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং শতাব্দী ধরে একটি অপরিহার্য পরিবেশগত অঞ্চল। এই অঞ্চলটি মাছ ধরা এবং মৌসুমী কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল হাজার হাজার স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনের জন্য সহায়ক।
২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে "রামসার স্থান" ঘোষণা করে, এর বৈশ্বিক পরিবেশগত মূল্য স্বীকার করে। এই হাওরটি এই অঞ্চলের জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ১৪০ প্রজাতির বেশি মাছ ধারণ করে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য
টাঙ্গুয়ার হাওর পাখিপ্রেমীদের জন্য একটি স্বর্গরাজ্য। প্রতি শীতে, সাইবেরিয়া, চীন এবং অন্যান্য ঠান্ডা অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে আসে।
বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে:
২০০+ প্রজাতির পাখি, ১৪০+ প্রজাতির মাছ, বিভিন্ন উভচর এবং সরীসৃপ, অনেক বিরল জলজ উদ্ভিদ।
কিছু জনপ্রিয় পাখি হল:
- প্যালাসের মাছ ঈগল
- কটন পিগমি রাজহাঁস
- এশিয়ান ওপেনবিল
- লিটল গ্রেব
- হুইসলিং ডাক
জীববৈচিত্র্য টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাংলাদেশের অন্যতম ধনী জলাভূমি করে তুলেছে।
![]() |
| (Shimul Garden on the banks of Jadukata River, Sunamganj, Sylhet) |
টাঙ্গুয়ার হাওরের শীর্ষ আকর্ষণ
১. স্ফটিক স্বচ্ছ পানি
বর্ষা এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জল নীলাভ এবং স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
২. ওয়াচটাওয়ার
তাহিরপুর এবং বারেক টিলা থেকে সমগ্র হাওরের আশ্চর্যজনক আকাশী দৃশ্য দেখা যায়।
৩. বারেক টিলা
অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে একটি ছোট পাহাড়।
৪. পরিযায়ী পাখি (শীতকাল)
শীতকালে হাজার হাজার রঙিন পাখি দেখার জন্য সেরা সময়।
৫. হাউসবোট / নৌকা ভ্রমণ
ভ্রমণকারীরা ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাউসবোটে রাত কাটাতে পারেন এবং শান্ত জল উপভোগ করতে পারেন।
৬. শিমুল বাগান এবং যাদুকাটা নদী (কাছাকাছি স্থান)
বেশিরভাগ দর্শনার্থী তাদের টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণের সাথে এই আকর্ষণগুলিকে একত্রিত করে।
ভ্রমণের সেরা সময়
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি: পাখি দেখার মৌসুম
জুন থেকে সেপ্টেম্বর: জলে ভরা হাওর, ছবি তোলার জন্য উপযুক্ত
অক্টোবর-নভেম্বর: পরিষ্কার আবহাওয়া, নীল জল, খুবই মনোরম
কীভাবে যাবেন (ঢাকা ও সিলেট থেকে)
ঢাকা থেকে:
১. সুনামগঞ্জের জন্য বাসে করে যান:
- এনা পরিবহন
- শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস
২. সুনামগঞ্জ সদর থেকে তাহিরপুরের জন্য মোটরবাইক, সিএনজি অথবা রিজার্ভ নৌকা ভাড়া করুন।
সিলেট থেকে:
-সিলেট → সুনামগঞ্জ (বাস/মাইক্রোবাসে ২ ঘন্টা)
- সুনামগঞ্জ → তাহিরপুর → টাঙ্গুয়ার হাওর
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
১. টাঙ্গুয়ার হাওর কি পর্যটকদের জন্য নিরাপদ?
হ্যাঁ, এটি নিরাপদ, বিশেষ করে ভ্রমণের মৌসুমে।
২. আমি কি রাত্রিযাপন করতে পারি?
হ্যাঁ, আপনি তাহিরপুর থেকে বুক করা হাউসবোটে থাকতে পারেন।
৩. টাঙ্গুয়ার হাওর কি পারিবারিক ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত?
হ্যাঁ, এটি পরিবার, দম্পতি এবং বন্ধুদের জন্য উপযুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ এবং সুন্দর জায়গা।



COMMENTS