পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী, একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনেস্কো সাইট যা বাংলার সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য প্রদর্শন করে।

 

Paharpur Buddhist Monastery, Rajshahi

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী

"পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার", যা "সোমপুর মহাবিহার" নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের সবচেয়ে অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলির মধ্যে একটি। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারটি আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অতীত এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার বিশ্বজুড়ে পর্যটক, গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং আধ্যাত্মিক সন্ধানীদের আকর্ষণ করে চলেছে।


পাহাড়পুর বৌদ্ধ মঠের ইতিহাস

পাল রাজবংশ প্রায় ৪ শতাব্দী (৭৫০ খ্রিস্টাব্দ - ১১৭৪ খ্রিস্টাব্দ) ধরে স্থায়ী হয়েছিল। তখন এই স্থানটি সোমপুর মহাবিহার নামে পরিচিত ছিল।

"সোমপুর মহাবিহার" এটি আদি এবং ঐতিহাসিক নাম। পাল রাজবংশের ৮ম-১২শ শতাব্দী সময় এই নামটি ব্যবহৃত হত। প্রাচীন শিলালিপি এবং গ্রন্থে পাওয়া যায় এই মঠটি “পবিত্র সম্প্রদায়ের মহান মঠ”।

"পাহাড়পুর" এটি মঠটি অবস্থিত স্থানের আধুনিক/স্থানীয় নাম। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর গ্রামের নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক এই স্থানটিকে এখন সাধারণত বলা হয় “পাহাড়পুর বৌদ্ধ মঠ”

প্রাচীন বাংলার অন্যতম শক্তিশালী বৌদ্ধ সাম্রাজ্য পাল রাজবংশ এর রাজত্বকালে এই মঠটি নির্মিত হয়েছিল। রাজা "ধর্ম পাল" বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধ্যান, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুশীলনের জন্য খ্রিস্টীয় ৮ম-৯ম শতাব্দীর দিকে এই বিশাল মঠ কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেছিলেন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাহাড়পুর দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিব্বত, চীন, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ছাত্র এবং ভিক্ষুরা উচ্চ ধর্মীয় শিক্ষার জন্য এখানে আসতেন।

সোমপুর মহাবিহার ৮ম-১২শ শতাব্দীতে, যা আজ থেকে ১,০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে সক্রিয় ছিল। মঠটি প্রায় ৩০০-৩৫০ বছর ধরে সক্রিয় ছিল।

ইতিহাসবিদরা মাঝে মাঝে অনুমান করেন যে হাজার হাজার সন্ন্যাসী শতাব্দী ধরে এখানে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু কোন নিশ্চিত সংখ্যা নেই।

সেই সময়ে:

- কোনও আনুষ্ঠানিক "ছাত্র তালিকা" বা "স্নাতক রেকর্ড" রাখা হয়নি।

- সন্ন্যাসী বা ছাত্রের সংখ্যা গণনা করে এমন কোনও নথি টিকে ছিল না।

- প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় কেবল "সন্ন্যাসী কোষ" পাওয়া গেছে, লিখিত ছাত্র রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

অতএব, ইতিহাসবিদরা মঠ থেকে পড়াশোনা করা বা পাস করা ছাত্রদের সঠিক সংখ্যা গণনা করতে পারেনি।

এখানে ১৭৭টি সন্ন্যাসী কোষ ছিল, যার অর্থ প্রায় ১৭৭ জন ছাত্র/সন্ন্যাসী একই সময়ে বাস করতেন।

এটি প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার "বৃহত্তম বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়" গুলির মধ্যে একটি ছিল, কিন্তু নালন্দা এবং বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কোন স্নাতক ডিগ্রির রেকর্ড নেই।


পাহাড়পুর বৌদ্ধ মঠ বন্ধ হয়ে যাওয়ার দৈর্ঘ্য দিন পর এটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা শুরু করে।

পাহাড়পুরে প্রথম যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ১৯২৩-১৯২৪ সালে শুরু হয়েছিল এবং ১৯৩৪ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

মোট মূল খননকাল ১১ বছর এবং এই বছরগুলিতে যা পাওয়া গিয়েছিল:

- মঠের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা আবিষ্কৃত হয়েছে।

- পোড়ামাটির ফলক উন্মোচিত হয়েছে।

- কেন্দ্রীয় মন্দিরের কাঠামো ম্যাপ করা হয়েছে।

- সন্ন্যাসীদের কক্ষ, উঠোন, ড্রেন, সিঁড়ি এবং জিনিসপত্র নথিভুক্ত করা হয়েছে।


পরবর্তীতে এটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে স্বীকৃত হয়।

১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন প্রধান খনন শেষ হওয়ার পর, এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি নতুন খনন, সংরক্ষণ এবং গবেষণা পর্যায় সংঘটিত হয়েছে।

Paharpur Buddhist Monastery, Rajshahi
Paharpur Buddhist Monastery, Rajshahi

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের স্থাপত্য সৌন্দর্য

পাহাড়পুর তার অনন্য স্থাপত্য নকশার জন্য বিখ্যাত:

১. বিশাল বর্গাকার মঠ কাঠামো:

কমপ্লেক্সটি ১১ হেক্টর এলাকা জুড়ে এবং ১৭৭টি মঠ কোষ দ্বারা বেষ্টিত। এই কোষগুলি ধ্যান, অধ্যয়ন এবং ভিক্ষুদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হত।

২. কেন্দ্রীয় মন্দির (পিরামিডের মতো স্তূপ):

কেন্দ্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় স্থাপত্যের প্রভাবে পিরামিড শৈলীতে নির্মিত একটি সুউচ্চ মন্দির রয়েছে। যদিও আংশিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত, এর কাঠামো এখনও প্রাচীন বাংলার শৈল্পিক উৎকর্ষতা প্রতিফলিত করে।

৩. পোড়ামাটির ফলক

মন্দিরের দেয়াল হাজার হাজার পোড়ামাটির ফলক দিয়ে সজ্জিত যা চিত্রিত করে:

- বৌদ্ধ পুরাণ

- উদ্ভিদ ও প্রাণী

- মানব মূর্তি

- দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ

এই পোড়ামাটির নকশাগুলি বাংলাদেশে আবিষ্কৃত সেরা শিল্পকর্মগুলির মধ্যে একটি।


পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত গুরুত্ব

সোমপুর মহাবিহার কেবল একটি ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল না, এটি একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। বৌদ্ধ দর্শন, সাহিত্য, শিল্প, ধর্মগ্রন্থ, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসা এখানে পড়ানো হত।

এটি বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষা নেটওয়ার্কের অংশ ছিল, এর সাথে ছিল:

- নালন্দা মহাবিহার (ভারত)

- বিক্রমশীলা মহাবিহার (ভারত)

- ওদন্তপুরী মহাবিহার (ভারত)

এটি পাহাড়পুরকে উপমহাদেশের বৌদ্ধিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় করে তোলে।


পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার কেন যাবেন

দর্শকরা পাহাড়পুরকে অনেক কারণে পছন্দ করেন:

- প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা অন্বেষণ করতে।

- শান্তিপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক পরিবেশ অনুভব করতে, অনন্য পোড়ামাটির শিল্প অধ্যয়ন করতে।

- ঐতিহাসিক আলোকচিত্র উপভোগ করতে, গৌরবময় পাল রাজবংশ সম্পর্কে জানতে।

এই স্থানটি একটি শান্ত এবং রাজকীয় পরিবেশ প্রদান করে, যা ইতিহাস প্রেমী এবং ভ্রমণকারীদের জন্য উপযুক্ত।


পাহাড়পুরে কীভাবে যাবেন

পাহাড়পুর রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বাদলগাছী উপজেলাতে অবস্থিত।

আপনি এখান থেকে যেতে পারেন:

ঢাকা → নওগাঁ → পাহাড়পুর

নওগাঁ/সান্তাহারে বাস বা ট্রেন → পাহাড়পুরে স্থানীয় পরিবহন।

রাজশাহী → নওগাঁ → পাহাড়পুর

সরাসরি বাস বা স্থানীয় পরিবহন।

প্রবেশ ফি এবং পরিদর্শনের সময়:

বাংলাদেশী দর্শনার্থী: সাশ্রয়ী মূল্যের প্রবেশ ফি

বিদেশী দর্শনার্থী: সরকারি নিয়ম অনুসারে বেশি ফি

খোলার সময়: সাধারণত সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা (শীতকাল এবং গ্রীষ্মকালে পরিবর্তিত হয়)

ছাত্র এবং গবেষকদের জন্য বিশেষ প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যেতে পারে।


ভ্রমণের সেরা সময়

পাহাড়পুর ঘুরে দেখার সেরা সময় হল:

অক্টোবর থেকে মার্চ → মনোরম আবহাওয়া

গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে, তাই শীতকাল আরও উপভোগ্য।


পাহাড়পুর কেন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান

UNESCO পাহাড়পুরকে স্বীকৃতি দিয়েছে কারণ:

- এর ব্যতিক্রমী স্থাপত্য নকশা।

- দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় মন্দির নির্মাণে এর প্রভাব।

- একটি প্রধান বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে এর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।

- এর সুসংরক্ষিত পোড়ামাটির শিল্প।

এটি প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার একটি বিরল নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে।


উপসংহার

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার কেবল বাংলাদেশের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়ই নয় বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞান, শিক্ষা এবং শৈল্পিক উৎকর্ষতার প্রতীকও। এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি পরিদর্শন করলে বাংলার ইতিহাস এবং পাল রাজবংশের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির সাথে গভীর সংযোগ পাওয়া যায়।

যদি আপনি অতীত অন্বেষণ করতে আগ্রহী হন, তাহলে পাহাড়পুর এমন একটি গন্তব্য যা আপনার মিস করা উচিত নয়।


Electronic currency exchangers rating
Name

Bangladesh,8,Farming & Gardening,2,Hills & Forest,11,Historical Place,18,India,15,River & Sea,12,
ltr
item
Bisho Porichiti: পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, রাজশাহী, একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনেস্কো সাইট যা বাংলার সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য প্রদর্শন করে।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEiPaknWfOJ4nmrWBl-S7NDCZUwp8HlxnRLGA0eqBc00kDBdOPIsSMfpiQDJKf2lF4UOXaUd8Vh1diub0hhmIDWfj1lWsaCpP_5Q2ErnSeMUsl2EDI9Liyclq2FfuWU7XZyqdLvpYQ8yk8Xu2Nw0_J4Kz8FU3sJtmKGxOCLhDuVBFwdrokSwQxuV3G1xlw/w640-h480/paharpur-buddhist-monastery-rajshahi.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEiPaknWfOJ4nmrWBl-S7NDCZUwp8HlxnRLGA0eqBc00kDBdOPIsSMfpiQDJKf2lF4UOXaUd8Vh1diub0hhmIDWfj1lWsaCpP_5Q2ErnSeMUsl2EDI9Liyclq2FfuWU7XZyqdLvpYQ8yk8Xu2Nw0_J4Kz8FU3sJtmKGxOCLhDuVBFwdrokSwQxuV3G1xlw/s72-w640-c-h480/paharpur-buddhist-monastery-rajshahi.jpg
Bisho Porichiti
https://www.bishoporichiti.com/2025/12/paharpur-buddhist-monastery-rajshahi.html
https://www.bishoporichiti.com/
https://www.bishoporichiti.com/
https://www.bishoporichiti.com/2025/12/paharpur-buddhist-monastery-rajshahi.html
true
49653395935087111
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Readmore Reply Cancel reply Delete By Home PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content