খান জাহান আলী কর্তৃক নির্মিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক সম্পদ।
ষাট গম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট
ষাট গম্বুজ মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে "ষাট গম্বুজ মসজিদ" নামে পরিচিত, বাংলাদেশের অন্যতম প্রতীকী ঐতিহাসিক নিদর্শন। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত এই শতাব্দী প্রাচীন মাস্টারপিসটি স্থাপত্যের উজ্জ্বলতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বাংলার সুলতানির স্বর্ণযুগের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত এই মসজিদটি প্রতি বছর হাজার হাজার দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করে। ষাট গম্বুজ মসজিদটি বাংলার ইসলামী স্থাপত্যের এক কালজয়ী বিস্ময়।
ষাট গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস
মসজিদটি পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে খান জাহান আলী দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, যিনি একজন শ্রদ্ধেয় সুফি সাধক এবং প্রশাসক ছিলেন । যিনি বাগেরহাট (পূর্বে "খলিফাতাবাদ") শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল একটি পরিকল্পিত ধর্মীয় শহর তৈরি করা এবং ষাট গম্বুজ মসজিদটি এর কেন্দ্রীয় প্রার্থনা কক্ষ এবং সম্প্রদায়ের স্থান হিসেবে কাজ করেছিল।
মূল ঐতিহাসিক তথ্য
নির্মাণকাল: ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ
প্রতিষ্ঠাতা: খান জাহান আলী
স্থাপত্যশৈলী: তুঘলক-প্রভাবিত ইসলামী স্থাপত্য
ইউনেস্কোর উপাধি: ১৯৮৫
"ষাট গম্বুজ মসজিদ" নামকরণ করা সত্ত্বেও, মসজিদের ভিতরে ৭৭টি গম্বুজ এবং মসজিদের চার কোণায় ৪টি উঁচু মিনার রয়েছে, মিনার গুলি দেখতে গম্বুজ সাদৃশ্য (সাধারণত মসজিদের মিনার গুলো দেখতে গম্বুজ সাদৃশ্যই হয় ), চার কোণার ৪টি উঁচু মিনার সহ মোট ৮১টি গম্বুজ। নামটি সম্ভবত মসজিদের ভিতরে ব্যবহৃত ষাটটি পাথরের স্তম্ভ থেকে এসেছে।
ষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য
মসজিদটি ইসলামী, বাঙালি এবং তুঘলক স্থাপত্য শৈলীর এক সুন্দর মিশ্রণ।
১. বহির্ভাগ
- ভবনটি আয়তাকার, পুরু, প্রাচীন লাল ইট দিয়ে তৈরি।
- প্রবেশপথের জন্য পূর্ব দিকে ১১টি খিলানযুক্ত দরজা রয়েছে।
- মসজিদের ৪ কোণার মিনারগুলি কাঠামোর উপরে উঠে গেছে, প্রতিটিতে একসময় একটি করে সিঁড়ি ছিল বলে মনে করা হয়।
২. গম্বুজ
- ৭৭টি নিচু গম্বুজ সাত সারিতে সাজানো।
- মিহরাব এলাকার উপরে ১টি বড় গম্বুজ।
৩. অভ্যন্তর
- মসজিদের অভ্যন্তরভাগ ৬০টি পাথরের স্তম্ভ দ্বারা সমর্থিত, যা একটি মনোমুগ্ধকর গ্রিডের মতো প্যাটার্ন তৈরি করে।
- সুন্দর খোদাই, দেয়াল এবং স্তম্ভগুলিকে সাজিয়ে তোলে।
- কৌশলগতভাবে স্থাপন করা খিলানযুক্ত জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
ষাট গম্বুজ মসজিদ কেবল একটি স্থাপত্য নিদর্শনই নয় বরং গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের স্থানও বটে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি নিম্নলিখিত হিসাবে কাজ করে আসছে:
- প্রার্থনা ও শিক্ষার কেন্দ্র
- একটি সম্প্রদায়ের সমাবেশস্থল
- বাংলায় শান্তিপূর্ণ ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতীক
কাছাকাছি খান জাহান আলীর মাজার অবস্থিত, যা সমগ্র স্থানটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান করে তুলেছে।
ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পশ্চিমে খান খানজাহান দীঘির (খঞ্জালী দীঘি) উত্তর পাশে জাহান আলীর মাজার অবস্থিত।
![]() |
| খান জাহান আলীর সমাধির সামনে খান জাহান আলীর দিঘি |
মসজিদটি কীভাবে পরিদর্শন করবেন
অবস্থান:
স্থান: ষাট গম্বুজ মসজিদ
উপজেলা: বাগেরহাট সদর
জেলা: বাগেরহাট
বিভাগ: খুলনা
দেশ: বাংলাদেশ (দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশ)।
কীভাবে যাবেন
খুলনা থেকে: বাস বা গাড়িতে ৪০-৪৫ মিনিট
ঢাকা থেকে: বাগেরহাটে এসি/নন-এসি বাস (৫-৬ ঘন্টা)
নিকটতম প্রধান শহর: খুলনা
ভ্রমণের সেরা সময়
- নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (শীতকাল)
- সেরা ফটোগ্রাফির জন্য বিকেলের সময়
ষাট গম্বুজ মসজিদ কেন অবশ্যই পরিদর্শন করা উচিত
এই স্থানটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রাথমিক ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম সেরা উদাহরণ। এর নির্মল পরিবেশ, ঐতিহাসিক মূল্য এবং স্থাপত্যের নিখুঁততা এটিকে ভ্রমণকারী, গবেষক এবং ফটোগ্রাফি প্রেমীদের জন্য অবশ্যই দেখার মতো গন্তব্য করে তোলে।
উপসংহার
ষাট গম্বুজ মসজিদ আজ বাংলাদেশের একটি চিরন্তন ঐতিহ্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে খান জাহান আলীর নিষ্ঠা, কারুশিল্প এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে, এটি বাংলার গর্বের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এর সৌন্দর্য এবং ইতিহাস দিয়ে দর্শনার্থীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।



COMMENTS